বিয়ের আনন্দে নাচছে যমুনাপাড়ের জনপদ চর রূপসা । Marriage Ceremony At

Munshi Anayet

Munshi Anayet

55,846 views

বাংলাদেশ কি একদিন চর রূপসার মতো দেশি মাছ শূন্য হবে?

প্রায় তিন বছর ধরে আমি বাংলাদেশের চরাঞ্চল নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র বানিয়ে আসছি। চর নিয়ে যখনই ভাবি চোখের সামনে ভেসে উঠে অবারিত প্রান্তর জুড়ে বালুময় প্রান্তর, ঘোড়ার গাড়ি আর দেশি মাছ।

চরের বাসিন্দাদের সাথে যেন দেশি মাছের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। বাড়িতে সামান্য চাল থাকলেও উঠানের মাচানের সবজি আর এক থালা মাছ দিয়ে তারা তিনবেলা খায়।
বর্ষার যে নালি দিয়ে নদীতে পানি নেমে যায় সেটি ধরে মাছ উঠে আসে। এবছরই জুলাই মাসের বৃষ্টিতে ফরিদপুরের নটাখোলা চরে শত শত মানুষ খালুই ভরে মাছ ধরেছেন। একইসাথে মাছ ধরা এবং উৎসবে রূপ নিয়েছিল।

২০২৪ সালে, প্রতি শুক্রবার ও শনিবার ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের এমপিডাঙ্গী ঘাট ও হাজীগঞ্জ থেকে কয়েকটি টলার ভরে শত শত মানুষ পলো নিয়ে মাছ ধরতে যেত। একবার আমিও গিয়েছিলাম। সবার হাতেই বোয়াল, শোল আর গজার মাছ।
গত বছর আমি নিয়মিত যোগাযোগ করেছি তাদের সাথে আবারও গিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করবো।
অর্ধশতাধিক মানুষ গেলেও ফিরে এসেছেন রিক্ত হস্তে। সেই যাত্রা সপ্তাহ খানেক চলার পর একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরেছেন সবাই। আমারও আর যাওয়া হয়নি।

এ বছর মাছের মৌসুমে দৌলতদিয়ার বাবু সর্দার , শওকত কাজী, শাকিল সর্দার , সোহান সর্দারসহ আরো কয়েকজনের টলারে আমি ১২০ঘন্টার একটি নির্ঘুম অভিযান করি। প্রচণ্ড ঝড় ঢেউয়ের ভেতরেও জেলেরা বড়বড় সাইজের রুই কাতল পায়। সে সময় প্রায় সবাই দাদনের টাকা পরিশোধ করতে সক্ষম হয়।

আমি চলে আসার পরেই দেশের গণমাধ্যমে দেখলাম, চাঁদপুর ও পালের চরে প্রচুর পাঙাশ মাছ ধরা। পাঙ্গাশের দীর্ঘদিনের বিচরণের জায়গা নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন কয়েকজন মৎস্য বিজ্ঞানী।

সেই আশঙ্কায় যেন সত্যিই হলো :  , এ বছর অগস্ট ,সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দৌলতদিয়া ঘাটে দিনে দুই থেকে তিনটি পাঙাশ মাছ এসেছে। অন্যান্য বছরগুলোতে এসময় পাঙ্গাশে পাঙ্গাশে ভরে যায়। এখানকার জেলেরা জাল ফেলে সবাই ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে, যার ফলে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও বাবু সর্দারদের মতো অনেকেই মাস খানেক টলার নিয়ে নামার সাহস পায়নি। সেপ্টেম্বরে শেষ সপ্তাহে নেমে অক্টোবরের ৫ তারিখ পর্যন্ত জাল ফেললেও একটা ইলিশ ও দুইটা রিটা ছাড়া কিছুই জুটেনি।

এরপর বলি আরেকটি অভিজ্ঞতা , যারা ডুবিয়ে মাছ ধরেন তাদের সাথে প্রতিবছরই একবার যাই। এ বছর দৌলতদিয়ার মোস্তফা কাজী ভাইয়ের দলের সাথে একদিন ওপারের কুশাহাটা এবং বিশ্বনাথপুর চরে সারাদিন ঘুরি। উনারা প্রতিবছর যেখান দিয়ে মাছ ধরেন সেখানে সারাদিন ডুবিয়ে ছয়জনে মাত্র আধা কেজি মাছ নিয়ে ফেরেন, অথচ একসময়ে তারা আট দশ মাছ ধরেন।

গত ২৬ অগস্ট সিরাজগঞ্জের চর রূপসা হাটে যাই। হাটের আকার মাঝারি হলেও অন্তত বিশটি চরের মানুষ আসে। অর্ধশতাধিক মাছের পসরা দেখলেও পাঙাশ, চাষের রুই, কাতল এবং একটি দোকানে সামুদ্রিক চিংড়ির বাইরে কোনো দেশি মাছ চোখে পড়েনি।
আমি কয়েকজন বাসিন্দার সাথে কথা বলি। গত কয়েক বছর জলাশয়ে যেমন :  পড়েছে চায়না দোয়ারি আর পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের শক আর বিষ। এখন খাল এবং বিলে কোনো মাছই নেই।

যেভাবে পদ্মা যমুনায় বিষ , চায়না জোয়ার আর বিদ্যুতের শক আর নদীর মোহনায় কারেন্ট জাল পেতে মাছ ধ্বংসের প্রতিযোগিতা চলছে, অদূর ভবিষ্যতে পুরো দেশ চর রূপসাতে রূপান্তরিত হবে।